প্রকাশিত : ১২:৩৬
১৯ জুলাই ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪২
১৯ জুলাই ২০২৫
ভারতের বহুল আলোচিত এবং সমালোচিত বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা RAW (Research and Analysis Wing) দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি অপ্রকাশ্য প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত। যদিও RAW সরাসরি মাঠপর্যায়ে নেমে তৎপরতা চালায় না বলেই পরিচিত, তথাপি সংস্থাটির কর্মকৌশল এতটাই নিখুঁত ও ছদ্মবেশী যে এর কার্যক্রম শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশেও এ সংস্থার উপস্থিতি নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক, উদ্বেগ ও বিশ্লেষণ চলছে।
প্রশ্ন উঠছে—‘র’ কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে? কীভাবে এখানকার রাজনীতি, গণমাধ্যম, এনজিও এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় রাখছে? এ প্রতিবেদন সেই প্রশ্নেরই অনুসন্ধান।
'র' কী এবং কেন বাংলাদেশে সক্রিয়?
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতের এই বাহ্যিক গোয়েন্দা সংস্থা RAW মূলত আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের নিরাপত্তা, কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। পাকিস্তান, চীন ও বাংলাদেশ—এই তিন দেশ RAW-এর নজরদারির কেন্দ্রে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, কখনো কখনো তা নিরাপত্তা হুমকির রূপ ধারণ করে—এমন আশঙ্কা থেকেই RAW বাংলাদেশে সক্রিয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে ইসলামী রাজনৈতিক দলের উত্থান, চীন ও তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি এবং ভারতের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির সম্ভাবনা RAW-কে বাংলাদেশ সম্পর্কে ক্রমাগত সজাগ থাকতে বাধ্য করছে।
RAW কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে?
১. কূটনৈতিক আড়ালে প্রবেশ:
ভারতীয় হাইকমিশনের অধীনে থাকা কিছু কর্মকর্তা আসলে RAW-এর সদস্য হিসেবে কাজ করেন—এমন দাবি করেছেন একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ‘কালচারাল অ্যাটাশে’, ‘প্রেস অ্যাফেয়ার্স অফিসার’ বা ‘একাডেমিক পর্যবেক্ষক’ পরিচয়ে তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন।
২. সংস্কৃতি ও এনজিওর ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশ:
RAW অনেক সময় এনজিও, রিসার্চ সেন্টার বা মানবিক উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে তাদের সদস্যদের বাংলাদেশে পাঠায়। "সাহিত্য", "শিক্ষা", "সামাজিক উন্নয়ন" ইত্যাদি বিষয়ের নামে এরা স্থানীয় সমাজে ঢুকে পড়ে এবং গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে। ভারতীয় সংস্কৃতি প্রসারের নামে পরিচালিত হিন্দি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও যোগ ব্যায়াম ক্লাবগুলোর পেছনে কারা আছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. স্থানীয় দালাল নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তার:
RAW অনেক সময় প্রভাবশালী রাজনীতিক, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা ছাত্রনেতাদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সুবিধা দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ন্ত্রণে আনে। এদের ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় তথ্য সংগ্রহ এবং নীতিনির্ধারণী মহলে প্রভাব বিস্তার করে।
৪. বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ:
ভারতীয় টেলিকম ও সফটওয়্যার কোম্পানির মাধ্যমে RAW মাঝে মাঝে প্রযুক্তিগতভাবে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। কল ডেটা রেকর্ড, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, এমনকি কিছু মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে নাগরিকদের গতিবিধি নজরদারির আওতায় আনা হয়।
RAW-এর বাংলাদেশে কার্যক্রমের ধরণ
১. রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ:
RAW সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ না করলেও, সকল দলের ওপরই নজর রাখে। কে ভারতের পক্ষে, কে ভারতের স্বার্থে হুমকি—তা বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করে। নির্বাচনের আগে ভারতপন্থী প্রোপাগান্ডা চালাতে কিছু গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে।
২. সীমান্ত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ:
RAW মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে সচেষ্ট। অনেক সময় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়োগ দিয়ে সীমান্ত অঞ্চলে গোপন নজরদারি চালায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা—এই এলাকাগুলো তাদের বিশেষ নজরে থাকে।
৩. ইসলামী সংগঠন ও মাদ্রাসার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ:
RAW-এর ধারণা, কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ইসলামপন্থী সংগঠন ভবিষ্যতে ভারতের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই তারা নিয়মিত এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালায়। স্থানীয় প্রশাসনকে গোপনে তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনাতেও ভূমিকা রাখে।
৪. মিডিয়া ও তথ্যযুদ্ধে সম্পৃক্ততা:
RAW “অফলাইন” তৎপরতার চেয়ে “অনলাইন” তথ্যযুদ্ধে বেশি সক্রিয়। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো মাধ্যমে বাংলাদেশি পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রোপাগান্ডা চালায়। এমনকি কিছু অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলকে অর্থায়ন করে ভারতপন্থী কনটেন্ট প্রচার করানোর অভিযোগও রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ও তথ্যসূত্র
২০০৪ সালে RAW-এর সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মকর্তাকে "পছন্দনীয় নয়" (persona non grata) ঘোষণা করে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
২০১৫ সালে ঢাকায় ভারতীয় এক ‘সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা’র কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তাকে গোপনে ফেরত পাঠানো হয়।
২০২০ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, একটি ভারতীয় এনজিও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় “মানবিক সহায়তা”-র আড়ালে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে লিপ্ত ছিল।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের র্যাব, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ভারতীয় হাইকমিশন ও RAW-এর সম্ভাব্য তৎপরতা সম্পর্কে অবগত। তবে কূটনৈতিক জটিলতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতার কারণে অনেক সময় সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। তবুও সময়-সময় কিছু ভারতীয় নাগরিককে "কাজের অনুমতির শর্ত লঙ্ঘন", "তথ্য গোপন" বা "সন্দেহজনক কার্যক্রম"-এ জড়িত থাকার কারণে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার (অব.) বলেন,
“বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলকে বুঝতে হবে—মিত্র রাষ্ট্র হলেও যদি তারা আমাদের রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ব্যাহত করে, তবে সেটি আমাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। RAW-এর মতো সংস্থার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতিমালা থাকা আবশ্যক।”
করণীয় কী?
১. কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেই বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চালানো।
২. এনজিও ও বিদেশি কর্মীদের লাইসেন্স, কার্যক্রম ও আর্থিক উৎস নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা।
৩. অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিদেশি প্রভাব রোধে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় করা।
৪. রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দেশপ্রেম ও তথ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশ যদি দীর্ঘমেয়াদে তার সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, তবে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন—জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করার সুযোগ নেই।